ডলি জহুর নামটি বাংলাদেশের অভিনয়াঙ্গনের এক অনন্য অধ্যায়ের নাম। মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে কয়েক দশকের পথচলায় তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন দেশের অন্যতম শক্তিমান অভিনেত্রী হিসেবে। অসংখ্য দর্শকের কাছে তিনি শুধু একজন শিল্পী নন, বরং আবেগ, মমতা ও অভিনয় দক্ষতার এক উজ্জ্বল প্রতীক।
আজ এই কিংবদন্তি অভিনেত্রীর জন্মদিন। ১৯৫৩ সালের ১৭ জুলাই ঢাকার গ্রীন রোডে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। শিক্ষাজীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ থেকেই যুক্ত হন নাট্যচর্চায়। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে মঞ্চে অভিনয়ের মাধ্যমে তার শিল্পীজীবনের সূচনা। পরে তিনি ‘নাট্যচক্র’ এবং ‘কথক’ নাট্যদলের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাজ করেন।
মঞ্চে ডলি জহুরের উত্থান ছিল বেশ আলোচিত। বিশেষ করে ‘মানুষ’ নাটকে সন্ধ্যারানী চরিত্রে তার অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায়। এছাড়া ‘ময়ূর সিংহাসন’ ও ‘ইবলিশ’ নাটকেও তিনি নিজের অভিনয় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন।
মঞ্চের সফলতা পেরিয়ে তিনি টেলিভিশন নাটকে পা রাখেন। কথাসাহিত্যিক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের প্রথম ধারাবাহিক নাটক ‘এইসব দিনরাত্রি’র মাধ্যমে ছোটপর্দায় তার যাত্রা শুরু হয়। এরপর একে একে ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘একদিন হঠাৎ’, ‘শেষ পত্র’, ‘স্ক্যান্ডাল’, ‘নোয়াশাল’, ‘মামলাবাজ’, ‘ক্ষণিকালয়’ সহ অসংখ্য জনপ্রিয় নাটকে অভিনয় করে দর্শকদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়ে নেন। পাশাপাশি শতাধিক একক নাটকেও দেখা গেছে তাকে।
চলচ্চিত্রে ডলি জহুরের অভিষেক ঘটে ‘অসাধারণ’ সিনেমার মাধ্যমে। পরবর্তীতে হুমায়ূন আহমেদের ‘শঙ্খনীল কারাগার’ ও ‘আগুনের পরশমণি’সহ বহু আলোচিত চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি প্রশংসিত হন। ‘দারুচিনি দ্বীপ’, ‘রং নম্বর’, ‘শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ’, ‘অনন্ত ভালোবাসা’, ‘কুলি’, ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘দীপু নাম্বার টু’সহ শতাধিক সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি।
চলচ্চিত্রে মায়ের চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে ডলি জহুর বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। পর্দায় তার মমতাময়ী উপস্থিতি দর্শকদের আবেগাপ্লুত করেছে বারবার। অভিনয়ে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি দুইবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। ‘শঙ্খনীল কারাগার’-এ রাবেয়া চরিত্র এবং ‘ঘানি’ চলচ্চিত্রে অনবদ্য অভিনয়ের জন্য এই সম্মাননা পান তিনি।
ব্যক্তিজীবনে অভিনেতা জহুরুল ইসলামের সঙ্গে সংসার গড়েন ডলি জহুর। মঞ্চে একসঙ্গে কাজ করতে গিয়েই তাদের পরিচয়, বন্ধুত্ব এবং পরবর্তীতে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯৭৬ সালের ৫ নভেম্বর তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে অসংখ্য চরিত্রের মাধ্যমে দর্শকদের ভালোবাসা অর্জন করা ডলি জহুর এখনো অভিনয়ে সক্রিয়। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য তিনি হয়ে উঠেছেন অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল নাম। জন্মদিনে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এই গুণী অভিনেত্রীর প্রতি রইল শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা।