• বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ০৯:০৪ অপরাহ্ন

চলচ্চিত্র আমার স্বপ্ন নয়, এটা ছিল নিয়তি: সোহেল রানা

এম.আর.জে শান্ত / ৭১ পঠিত
আপডেট : শনিবার, ৯ মে, ২০২৬

বাংলাদেশ চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অনন্য নাম মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা। একাধারে তিনি মুক্তিযোদ্ধা, চলচ্চিত্র প্রযোজক, পরিচালক এবং অভিনেতা হিসেবে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে দেশের সিনেমা জগতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছেন। তার ক্যারিয়ার শুধু অভিনয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প গড়ে ওঠার শুরুর দিককার অন্যতম শক্ত ভিত হিসেবেও তাকে বিবেচনা করা হয়।
এক সময়ের জনপ্রিয় অ্যাকশন হিরো সোহেল রানা ১৯৭০-এর দশক থেকে চলচ্চিত্রে সক্রিয় হন। “ওরা এগারো জন” চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তার প্রযোজনা ও অংশগ্রহণ দেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমার ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে নেয়। পরবর্তীতে তিনি “মাসুদ রানা”, “এপার ওপার”, “দোস্ত দুশমন”, “মা”, “বারুদ”সহ অসংখ্য জনপ্রিয় সিনেমায় অভিনয় করেন, যা তাকে বাণিজ্যিকভাবে সফল ও দর্শকপ্রিয় অভিনেতায় পরিণত করে।
নিজের জীবনের দর্শন নিয়ে তিনি বলেন, চলচ্চিত্রে আসা তার ব্যক্তিগত কোনো পরিকল্পনা ছিল না। তার ভাষায়, আমি সিনেমায় আসিনি কোনো স্বপ্ন নিয়ে। এটা আমার ডেস্টিনি ছিল। আল্লাহ যেভাবে লিখেছিলেন, সেভাবেই আমি এখানে এসেছি। তিনি আরও জানান, রাজনীতি, খেলাধুলা এবং শারীরিক অনুশীলনের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও চলচ্চিত্রে আসা তার জন্য এক স্বাভাবিক নিয়তি হয়ে দাঁড়ায়।
চরিত্র নির্বাচন নিয়ে প্রশ্নে তিনি বলেন, কোনো একটি চরিত্রকে আলাদা করে প্রিয় বলা কঠিন। প্রতিটি কাজই তিনি আন্তরিকভাবে করেছেন। তার মতে, একজন শিল্পীর কাছে সবচেয়ে বড় বিচারক দর্শক। তিনি বলেন, যেসব ছবিতে কাজ করেছি, সবই ভালো লাগার জায়গা থেকে করেছি। দর্শকের ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে বড় অর্জন।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ওঠানামা নিয়ে তিনি বলেন, কখনোই চলচ্চিত্র ছাড়ার কথা ভাবেননি। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজেই সিদ্ধান্ত নেন ধীরে ধীরে সরে আসার। তার মতে, একজন শিল্পীর উচিত সময় বুঝে থেমে যাওয়া। “রাজা যেমন সম্মানের সঙ্গে সিংহাসন ছাড়ে, শিল্পীকেও তেমনি সম্মান রেখে সরে আসতে হয়—এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই তিনি সক্রিয় কাজ থেকে দূরে সরে আসেন।
বর্তমান চলচ্চিত্র শিল্প নিয়ে তিনি কিছুটা হতাশা প্রকাশ করেন। তার মতে, আগের মতো সিনেমা এখন আর তৈরি হচ্ছে না এবং প্রেক্ষাগৃহ সংস্কৃতিও আগের অবস্থায় নেই। তিনি বলেন, একসময় দেশের সিনেমা হল ছিল দর্শকে ভরপুর, কিন্তু এখন সেই কাঠামো অনেকটাই দুর্বল। টিকিট মূল্য ও প্রদর্শন ব্যবস্থার কারণে সাধারণ দর্শকের জন্য সিনেমা দেখাও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, আধুনিক সময়ে কিছুটা কাজ হলেও পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র শিল্পের যে কাঠামো ছিল, তা অনেকটাই হারিয়ে গেছে। তার ভাষায়, আগে যেটা ফিল্ম ছিল, এখন সেটা অনেকটাই পরিবর্তিত। অনেক কিছুই আর আগের মতো নেই।
নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের প্রসঙ্গে তিনি সরাসরি নাম না বললেও বলেন, প্রতিভার অভাব নেই, কিন্তু সুযোগের অভাব রয়েছে। তার মতে, ভালো অভিনেতা, পরিচালক ও টেকনিশিয়ান থাকা সত্ত্বেও তারা সঠিক প্ল্যাটফর্ম পাচ্ছেন না। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ভালো খেলোয়াড় থাকলেও যদি মাঠ না থাকে, তাহলে তার প্রতিভা প্রকাশ পায় না।
তার দীর্ঘ ক্যারিয়ার এবং চলচ্চিত্রে অবদান নিয়ে বিশ্লেষকরা মনে করেন, সোহেল রানা বাংলাদেশের অ্যাকশন সিনেমা ও প্রযোজনা সংস্কৃতিকে একটি ভিত্তি দিয়েছে, যা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পথ তৈরি করেছে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রে তার অবদান এবং বাণিজ্যিক সিনেমায় সফলতা তাকে আলাদা অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে।
আজও তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ নাম হিসেবে বিবেচিত হন, যার কাজ ও বক্তব্য দুই-ই ইন্ডাস্ট্রির অতীত ও বর্তমানকে বুঝতে সহায়তা করে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category