• বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ০৯:০৫ অপরাহ্ন

চা বাগানের ছেলে থেকে সংগীতের কিংবদন্তি—সুবীর নন্দীর জীবনগাথা

ডেস্ক নিউজ / ৫৮ পঠিত
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২৬

এক সময় এপার বাংলার সংগীত জগতে ওপারের শিল্পীদের প্রভাব ছিল প্রবল। সেই ধারাকে বদলে দিয়ে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন এ দেশের কিছু ব্যতিক্রমী কণ্ঠশিল্পী। তাদের মধ্যে অন্যতম কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী সুবীর নন্দী। তার নাম উচ্চারিত হলেই যেন ভেসে আসে ‘দিন যায় কথা থাকে’, ‘বৃষ্টির কাছ থেকে কাঁদতে শিখেছি’, ‘আমি সাত সাগর পাড়ি দিয়ে’সহ অসংখ্য কালজয়ী গান।

১৯৫৩ সালের ১৯ নভেম্বর হবিগঞ্জের তেলিয়াপাড়া চা বাগানে জন্মগ্রহণ করেন সুবীর নন্দী। তার বাবা সুধাংশু নন্দী ছিলেন চা বাগানের মেডিকেল অফিসার এবং মা পুতুল রানী ছিলেন গৃহিণী। চা বাগানের সবুজ প্রকৃতির মাঝেই কেটেছে তার শৈশব। ছোটবেলার সেই দুরন্ত দিনগুলোই পরবর্তীতে তার ব্যক্তিত্ব ও সৃজনশীলতার ভিত গড়ে দেয়।

শৈশব থেকেই ছিলেন দুষ্টু ও সাহসী। কখনো ফুল তুলতে গিয়ে দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন, আবার কখনো বাজির খেলার সময় বিপদের মুখেও পড়েছেন। তবে এসব অভিজ্ঞতা তার জীবনের গল্পকে আরও জীবন্ত করে তুলেছে। পরিবারে সংগীতের পরিবেশও ছিল গভীর। বাবার সংগীতপ্রেম, ঘরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, লতা মঙ্গেশকর, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গান শোনা—এসবই তাকে সংগীতের পথে টেনে আনে। পরে তিনি শাস্ত্রীয় সংগীতে প্রশিক্ষণ নেন ওস্তাদ বাবর আলী খায়ের কাছে।

১৯৬৭ সালে সিলেট বেতারে প্রথম গান করার সুযোগ পান সুবীর নন্দী। বয়স কম থাকায় প্রাপ্তবয়স্ক দেখাতে এফিডেভিট পর্যন্ত করতে হয়েছিল। সেই থেকেই তার পেশাদার সংগীত জীবনের শুরু। স্বাধীনতার পর ঢাকায় এসে তার ক্যারিয়ার আরও বিস্তৃত হয়। বাংলাদেশ বেতারে তার প্রথম উল্লেখযোগ্য গান ‘যদি কেউ ধূপ জ্বেলে দেয়’ তাকে এনে দেয় পরিচিতি ও সম্ভাবনার নতুন দরজা।

ধীরে ধীরে তিনি নজরুল সংগীত থেকে আধুনিক গানের দিকে ঝুঁকে পড়েন। প্রথমদিকে কিছু সমালোচনা থাকলেও নিজের দৃঢ়তায় গড়ে তোলেন আলাদা একটি অবস্থান। লোকগানের পাশাপাশি আধুনিক চলচ্চিত্রের গান তাকে পৌঁছে দেয় সর্বস্তরের শ্রোতার কাছে। ১৯৭৬ সালে ‘সূর্য গ্রহণ’ চলচ্চিত্রে প্লেব্যাকের মাধ্যমে বড় পর্দায় যাত্রা শুরু, এরপর ‘অশিক্ষিত’ এবং বিশেষভাবে ‘দিন যায় কথা থাকে’ সিনেমার গান তাকে কিংবদন্তির মর্যাদায় পৌঁছে দেয়।

তার সংগীত জীবনে কাজ করেছেন দেশের প্রখ্যাত সংগীত পরিচালক ও গীতিকারের সঙ্গে। শেখ সাদী, সত্য সাহা, খান আতাউর রহমান, সুজেয় শ্যামসহ অনেকের সঙ্গেই তৈরি হয়েছে অসাধারণ সব গান। অডিও অ্যালবামেও তিনি ছিলেন সমান সফল, যেখানে প্রেম, বেদনা ও জীবনের গল্প উঠে এসেছে অনন্য সুরে।

প্রায় আড়াই হাজার গানের এই শিল্পী পেয়েছেন অসংখ্য সম্মাননা। তার মধ্যে রয়েছে তিনবার বাচসাস পুরস্কার, পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং ২০১৯ সালে দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদক।

ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন একজন ব্যাংক কর্মকর্তা। স্ত্রী পূরবী নন্দী এবং কন্যা ফাল্গুনী নন্দীকে নিয়ে ছিল তার পরিবার। জীবনের শেষ পর্যায়ে কিডনি ও হৃদরোগে ভুগে ২০১৯ সালের ৭ মে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

সুবীর নন্দী আজও বেঁচে আছেন তার গানের মধ্য দিয়ে, যা বাংলা সংগীতের ইতিহাসে এক অমলিন অধ্যায় হয়ে থাকবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category