ঢাকাই চলচ্চিত্রে নিজের অবস্থান তৈরি করতে একের পর এক ভিন্নধর্মী চরিত্রে অভিনয় করেছেন বিদ্যা সিনহা মিম। বাণিজ্যিক ছবির পাশাপাশি গল্প ও চরিত্রের বৈচিত্র্য তাঁকে দর্শকের কাছে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। ‘পরাণ’, ‘দামাল’ কিংবা ‘অন্তর্জাল’-এর মতো চলচ্চিত্রে তাঁর উপস্থিতি যেমন আলোচনায় এসেছে, তেমনি অভিনয়ের নানা দিক তুলে ধরার সুযোগও তৈরি হয়েছে। তবে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমার বাইরে মিমের ক্যারিয়ারে রয়েছে আরও কিছু কাজ, যেগুলো নিয়ে একসময় তৈরি হয়েছিল প্রত্যাশা, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেগুলো দর্শকের সামনে আসেনি।
কোনো সিনেমার শুটিং শুরু হয়, কোনোটি মাঝপথে থেমে যায়, আবার কোনোটি নির্মাণ শেষ করেও মুক্তির অপেক্ষায় পড়ে থাকে। চলচ্চিত্রের এই বাস্তবতা নতুন নয়। তবে একজন অভিনয়শিল্পীর ক্যারিয়ারে এমন অসমাপ্ত কিংবা অপ্রকাশিত কাজের গুরুত্বও কম নয়। কারণ, প্রতিটি চরিত্রই একজন শিল্পীকে নিজের অভিনয়ক্ষমতা নতুনভাবে তুলে ধরার সুযোগ করে দেয়। বিদ্যা সিনহা মিমের ক্ষেত্রেও এমন তিনটি সিনেমার কথা সামনে আসে—‘আমি ইয়াসমিন বলছি’, ‘ইত্তেফাক’ ও ‘দিগন্তে ফুলের আগুন’। গল্প, চরিত্র ও নির্মাণের ধরন বিবেচনায় সিনেমাগুলোতে মিমকে ভিন্ন আঙ্গিকে দেখার সম্ভাবনা ছিল।
প্রতিবাদী এক চরিত্রে অভিনয়ের অপেক্ষা:
মিমের ক্যারিয়ারে অভিনয়ের দিক থেকে ব্যতিক্রমী সংযোজন হতে পারত ‘আমি ইয়াসমিন বলছি’। ১৯৯৫ সালে দিনাজপুরে কিশোরী ইয়াসমিনকে ধর্ষণ ও হত্যার মর্মান্তিক ঘটনাকে অবলম্বন করে সিনেমাটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ঘটনাটি সে সময় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। পরবর্তী সময়ে এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও ন্যায়বিচারের দাবির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকে পরিণত হয়।
পরিচালক সুমন ধরের পরিকল্পনায় নির্মিতব্য এই সিনেমায় ইয়াসমিনের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন বিদ্যা সিনহা মিম। চরিত্রটি ছিল আবেগ, বেদনা ও প্রতিবাদের মিশেলে গড়া। এমন একটি বাস্তব ঘটনানির্ভর চরিত্রে অভিনয় করতে হলে কেবল সংলাপ কিংবা অভিব্যক্তির ওপর নির্ভর করলেই চলে না; চরিত্রটির প্রেক্ষাপট, মানসিক অবস্থা ও ঘটনার সামাজিক তাৎপর্যও উপলব্ধি করতে হয়ে। সে বিবেচনায় কাজটি মিমের অভিনয়জীবনে একটি উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারত।

চরিত্রটির জন্য প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন এই অভিনেত্রী। কিন্তু নানা প্রশাসনিক জটিলতা ও প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে সিনেমাটির কাজ আর এগোয়নি। ফলে বাস্তব ঘটনার গভীরতা ও সংবেদনশীলতা পর্দায় তুলে ধরার যে পরিকল্পনা ছিল, তা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। মিমের অভিনীত চরিত্রটি দর্শকের সামনে আসার সুযোগও তৈরি হয়নি। তাঁর ক্যারিয়ারের অপ্রকাশিত কাজগুলোর মধ্যে তাই সিনেমাটি আলাদা গুরুত্ব বহন করে।
সিয়াম-মিম জুটির সম্ভাবনা থেমে যায় মাঝপথে
অন্যদিকে, নির্মাতা রায়হান রাফীর ‘ইত্তেফাক’ সিনেমাকে ঘিরেও একসময় দর্শকের আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। এই ছবিতে চিত্রনায়ক সিয়াম আহমেদের বিপরীতে অভিনয় করার কথা ছিল মিমের। দুই অভিনয়শিল্পীকে একসঙ্গে বড় পর্দায় দেখার সম্ভাবনা তাঁদের ভক্তদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি করেছিল। কারণ, নতুন জুটি হিসেবে তাঁদের পর্দার রসায়ন কেমন হবে, তা নিয়ে দর্শকের আগ্রহ থাকারই কথা।
সিনেমাটির শুটিংও শুরু হয়েছিল। সে সময় প্রকাশিত কয়েকটি স্থিরচিত্রে সিয়াম ও মিমের ভিন্নধর্মী লুক নজর কেড়েছিল। ছবিগুলো থেকে সিনেমাটির চরিত্র ও উপস্থাপনা নিয়ে কিছুটা ধারণা পাওয়া গেলেও পুরো গল্প কিংবা তাঁদের অভিনয়ের বিস্তৃত রূপ দেখার সুযোগ আর তৈরি হয়নি। শেষ পর্যন্ত অসম্পূর্ণ অবস্থায় বন্ধ হয়ে যায় প্রকল্পটির কাজ।

একটি সিনেমা নির্মাণের প্রাথমিক পরিকল্পনা থেকে পর্দায় আসা পর্যন্ত অনেকগুলো ধাপ পেরোতে হয়। অভিনয়শিল্পী নির্বাচন, শুটিং, প্রযোজনা ও অন্যান্য বাস্তবতার সমন্বয় না হলে মাঝপথে থেমে যেতে পারে সম্ভাবনাময় উদ্যোগও। ‘ইত্তেফাক’-এর ক্ষেত্রেও সেই পরিণতি দেখা গেছে। ফলে সিয়াম-মিম জুটির সম্ভাব্য নতুন রসায়ন বড় পর্দায় দেখার অপেক্ষা আর পূরণ হয়নি। মিমের ক্যারিয়ারে সিনেমাটি থেকে যাওয়ার কথা ছিল একটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা হিসেবে, কিন্তু দর্শকের কাছে সেটি রয়ে গেছে অদেখা কাজের তালিকায়।
শুটিং শেষ, তবু মুক্তির অপেক্ষায় ‘দিগন্তে ফুলের আগুন’
অন্য দুটি সিনেমার সঙ্গে ‘দিগন্তে ফুলের আগুন’-এর পার্থক্য হলো, ছবিটির শুটিংয়ের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়েছে। তবু দর্শকের সামনে আসেনি এটি। শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লাহ কায়সারের স্ত্রী এবং লেখক-রাজনীতিবিদ পান্না কায়সারের লেখা ‘মুক্তিযুদ্ধ: আগে ও পরে’ অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে সিনেমাটি। ওয়াহিদ তারেক পরিচালিত ছবিটির প্রযোজক পান্না কায়সার ও শহীদুল্লাহ কায়সারের কন্যা, অভিনেত্রী শমী কায়সার।
এ সিনেমায় পান্না কায়সারের সংগ্রামমুখর জীবনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন বিদ্যা সিনহা মিম। ব্যক্তিগত জীবনের বেদনাবোধ, মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে চলার গল্প—সব মিলিয়ে চরিত্রটি মিমের জন্য ছিল ভিন্ন ধরনের এক চ্যালেঞ্জ। পরিচিত রোমান্টিক কিংবা বাণিজ্যিক ঘরানার চরিত্রের বাইরে গিয়ে এমন একটি ঐতিহাসিক ও জীবননির্ভর চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ তাঁর অভিনয়জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারত।

সিনেমাটির সঙ্গে মিমের ব্যক্তিগত আবেগেরও একটি বিশেষ যোগ রয়েছে। কাকতালীয়ভাবে, পান্না কায়সারের প্রয়াণদিনেই তাঁর সঙ্গে মিমের সাক্ষাতের কথা নির্ধারিত ছিল। ঘটনাটি ছবিটির স্মৃতিকে অভিনেত্রীর কাছে আরও আবেগঘন করে তুলেছে। চরিত্রটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জীবন ও অভিজ্ঞতার যোগসূত্র থাকায় কাজটি তাঁর কাছে নিছক আরেকটি সিনেমায় অভিনয়ের অভিজ্ঞতা হয়ে থাকেনি।
শুটিং শেষ হওয়ার পরও ছবিটি মুক্তি না পাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়েছে অপেক্ষা। ‘দিগন্তে ফুলের আগুন’ মুক্তি পেলে দর্শক পান্না কায়সারের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে চলচ্চিত্রের ভাষায় দেখার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে মিমের অভিনয়ের আরেকটি দিকও সামনে আসতে পারে। তবে ছবিটির মুক্তির তারিখ নিয়ে নিশ্চিত ঘোষণা না আসা পর্যন্ত সেই অপেক্ষার অবসান হচ্ছে না।
সম্ভাবনার গল্প, যা এখনো অসম্পূর্ণ
বিদ্যা সিনহা মিমের ক্যারিয়ারে ‘আমি ইয়াসমিন বলছি’, ‘ইত্তেফাক’ ও ‘দিগন্তে ফুলের আগুন’—তিনটি সিনেমাই ভিন্নধর্মী চরিত্রে নিজেকে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করেছিল। প্রথম দুটি সিনেমার কাজ থেমে গেলেও শেষেরটি নির্মাণ শেষ করে রয়েছে মুক্তির অপেক্ষায়। ছবিগুলো দর্শকের সামনে এলে মিমের অভিনয়ের আরও কিছু দিক আবিষ্কারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এখন দেখার বিষয়, ‘দিগন্তে ফুলের আগুন’ কবে মুক্তি পায় এবং বাকি প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ কী হয়।