বাংলা সংগীতের জীবন্ত কিংবদন্তি, সুরসম্রাজ্ঞী ফেরদৌসী রহমান আজ ৮৫ বছর পেরিয়ে ৮৬-তে পা রাখলেন। ১৯৪১ সালের ২৮ জুন পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারে জন্ম নেওয়া এই গুণী শিল্পী টানা সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে সুরের মূর্ছনায় মুগ্ধ করে চলেছেন বাংলা ভাষার শ্রোতাদের। ধ্রুপদি, নজরুলগীতি, রবীন্দ্রসংগীত, আধুনিক গান কিংবা চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক, প্রতিটি ধারাতেই তিনি রেখে গেছেন অনন্য স্বাক্ষর। তবে সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে তিনি এ দেশের কোটি মানুষের হৃদয়ে অমলিন এক নাম, সবার প্রিয় ‘খালামণি’।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইতিহাসের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে তার নাম। ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর বিটিভির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রথম কণ্ঠ দেন ফেরদৌসী রহমান। এর মাত্র দুই দিন পর, ২৭ ডিসেম্বর শুরু হয় শিশুদের জনপ্রিয় সংগীতবিষয়ক অনুষ্ঠান ‘এসো গান শিখি’। এই অনুষ্ঠানই তাকে শুধু একজন শিল্পী নয়, প্রজন্মের পর প্রজন্মের আদরের ‘খালামণি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
মজার বিষয় হলো, ‘খালামণি’ নামটি অন্য কারও দেওয়া নয়, এটি বেছে নিয়েছিলেন ফেরদৌসী রহমান নিজেই। ১৯৮০ সালে অনুষ্ঠানটির দায়িত্ব নেন প্রযোজক কামরুন্নেসা হাসান মিনুকা। একদিন অনুষ্ঠান নিয়ে আলাপের সময় ফেরদৌসী রহমান জানান, শিশুদের মুখে ‘আপা’ সম্বোধন তার ভালো লাগে না। আবার ‘নানি’ বা ‘দাদি’ বলেও ডাকুক, সেটিও তিনি চাননি। তখনই হাসিমুখে বলেছিলেন, ওরা আমাকে খালামণি বলবে। সেই মুহূর্তের সিদ্ধান্তই সময়ের সঙ্গে পরিণত হয়েছে এক আবেগঘন পরিচয়ে।
এক সাক্ষাৎকারে সেই স্মৃতি তুলে ধরে কামরুন্নেসা হাসান মিনুকা বলেন, “আপা বললেন, ‘আপা বললে আমার ভালো লাগে না। খালাম্মাও না, নানিও না, দাদিও না। ওরা আমাকে খালামণি বলবে।’ এরপর থেকেই সবাই তাকে খালামণি বলেই ডাকতে শুরু করে।
‘এসো গান শিখি’ শুধু একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠান ছিল না, ছিল এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে সংগীতচর্চার সেতুবন্ধন। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে অসংখ্য শিশুকে গান শিখিয়েছেন ফেরদৌসী রহমান। এমনও অনেক শিল্পী আছেন, যাদের তিনি ছোটবেলায় গান শিখিয়েছেন, পরে সেই শিল্পীদের সন্তান, এমনকি নাতি-নাতনিরাও তার কাছেই সংগীতের হাতেখড়ি নিয়েছে।
সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পদক (১৯৯৫), একুশে পদক (১৯৭৭) এবং জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আজীবন সম্মাননা (২০১৫)। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী সংগীত পরিচালক হিসেবেও ইতিহাসের অংশ হয়ে আছেন।
জন্মদিনে বয়স যেন তার কাছে শুধুই একটি সংখ্যা। বিদেশে চিকিৎসার সময় চিকিৎসকেরা জন্মসাল শুনে তার বয়স হিসাব করলেও, তার প্রাণবন্ত উপস্থিতি দেখে বারবার বিস্মিত হয়েছেন। সময়ের সঙ্গে বয়স বেড়েছে, কিন্তু নতুন কিছু করার স্বপ্ন, সংগীতের প্রতি ভালোবাসা আর প্রাণশক্তি আজও রয়ে গেছে আগের মতোই অটুট। তাই ৮৬-তেও ফেরদৌসী রহমান কেবল একজন শিল্পী নন, তিনি বাংলা সংগীতের এক জীবন্ত অনুপ্রেরণার নাম।