গারো পাহাড়ের পাদদেশ, চারপাশে সবুজের সমারোহ আর নৈসর্গিক লেক—এমন মনোরম পরিবেশেই ধারণ করা হয়েছে জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’র এবারের পর্ব। সীমান্তবর্তী জেলা জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার লাউচাপড়া অবসর বিনোদন কেন্দ্রের উন্মুক্ত চত্বরে তৈরি করা হয় অনুষ্ঠানের মূল মঞ্চ। প্রকৃতির সৌন্দর্যের সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে এবারের আয়োজনেও থাকছে নানা চমক।
‘ইত্যাদি’র শুটিং ঘিরে লাউচাপড়ায় ছিল উৎসবের আমেজ। জামালপুরের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও আশপাশের জেলা থেকে ছুটে আসেন হাজারো দর্শক। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি কিংবা ভ্যাপসা গরম—কোনো কিছুই তাদের দমাতে পারেনি। প্রিয় অনুষ্ঠানটির ধারণপর্ব সরাসরি উপভোগ করতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেন তারা।
এবারের আয়োজনে থাকছে দুটি ভিন্ন স্বাদের গান। এর একটি গানে কণ্ঠ দিয়েছেন শ্রোতাপ্রিয় শিল্পী পান্থ কানাই ও তসিবা বেগম। ‘ইত্যাদি’র মাধ্যমেই টেলিভিশন পর্দায় তাদের প্রথম পরিচয় ঘটে। লিটন অধিকারী রিন্টুর কথায় গানটির সুর ও সংগীতায়োজন করেছেন সুমন কল্যাণ।

জামালপুরকে ঘিরে এবারের পর্বে থাকছে বিশেষ জেলা পরিচিতিমূলক নৃত্যগীতও। এতে দ্বৈতকণ্ঠে গান গেয়েছেন জেলারই সন্তান মিজান মাহমুদ রাজীব ও সিঁথি সাহা। মনিরুজ্জামান পলাশের কথায় গানটির সুর ও সংগীতায়োজন করেছেন উজ্জ্বল সিনহা। এস কে জাহিদের নৃত্য পরিচালনায় স্থানীয় বাঙালি ও গারো সম্প্রদায়ের নৃত্য পরিবেশনা গানটিকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা।
‘ইত্যাদি’র নিয়মিত দর্শকপর্বেও এবার উঠে এসেছে জামালপুরের গল্প। অনুষ্ঠানটির প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, জামালপুরকে ঘিরে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে উপস্থিত দর্শকদের মধ্য থেকে চারজনকে নির্বাচন করা হয়। পরবর্তী সময়ে তারা জেলার চারজন স্মরণীয়-বরণীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের কালজয়ী চারটি গানের অংশবিশেষ পরিবেশন করেন। তাদের পরিবেশনায় মুগ্ধ হন উপস্থিত দর্শকরা।
শুধু গান-নাচ নয়, জামালপুরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মানুষের জীবনযাপনও উঠে এসেছে এবারের আয়োজনে। জেলার অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নকশিকাঁথা এবং ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘মিল্লি বা পিঠালি’ নিয়ে রয়েছে বিশেষ প্রতিবেদন। পাশাপাশি জেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ নিয়েও থাকছে তথ্যসমৃদ্ধ চিত্রায়ন।
দেশের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম ‘তুলসীপুর ঘোড়ার হাট’ নিয়েও রয়েছে ভিন্নধর্মী একটি প্রতিবেদন। নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত পরিবার, অভাবের কারণে বাল্যবিবাহের শিকার পরিবারগুলোর জীবনসংগ্রাম নিয়েও থাকছে মানবিক প্রতিবেদন। একই সঙ্গে জামালপুরে জন্ম নেওয়া চারজন কালজয়ী গুণী ব্যক্তিত্বের অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।

এবারের পর্বের অন্যতম অনুপ্রেরণাদায়ক আয়োজন শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে নিজেদের শ্রমে স্বাবলম্বী হওয়া ফেরদৌস হাসান বাপ্পী ও ওসনাই খাতুন দম্পতির জীবনসংগ্রামের গল্প। তাদের লড়াই ও সাফল্যের কাহিনি দর্শকদের জন্য হয়ে উঠতে পারে মানবিক এক অনুপ্রেরণা।
বিদেশি প্রতিবেদনেও থাকছে ভিন্ন স্বাদের আয়োজন। প্রাচীন ঐতিহ্য ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা চীনের নান্দনিক শহর ‘সুঝৌ’ নিয়ে থাকছে বিশেষ চিত্রায়ন। পাশাপাশি কাশেম টিভির রিপোর্টার ও তার নাতির প্রাণবন্ত আলাপও থাকছে এবারের পর্বে।
নিয়মিত আয়োজন চিঠিপত্র পর্বের পাশাপাশি সমসাময়িক নানা সামাজিক অসংগতি ও প্রবণতাকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরা হয়েছে বেশ কিছু নাট্যাংশে। ‘স্বল্প প্রাণ ভাইরাল গান’, ‘ডিজিটাল ট্রলের ট্রমা’, ‘ভক্তের অন্ধ ভক্তি’, ‘ফাঁপা পূর্তির ফূর্তি’, ‘সম্মান দিলে সম্মান মেলে’, ‘অনলাইন সোলজার’, ‘তৈল বিদ্যা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’, ‘লাইভ টকের ঝুঁকি’ ও ‘পরজীবী মানুষ’—এমন বেশ কয়েকটি নাট্যাংশে উঠে এসেছে সময়ের নানা অসংগতি।
এসব নাট্যাংশে অভিনয় করেছেন সোলায়মান খোকা, মীর নাসিমুল ইসলাম সেলিম, সুভাশিষ ভৌমিক, আবদুল্লাহ রানা, আব্দুল আজিজ, জিল্লুর রহমান, আমিন আজাদ, আনন্দ খালেদ, মুকিত জাকারিয়া, সুমন পাটোয়ারী, সাইদুর রহমান পাভেল, আশরাফুল আলম সোহাগ, এমএনইউ রাজু, আনোয়ার শাহী, তারিক স্বপন, মুকুল সিরাজ, সুজাত শিমুল, আবু হেনা রনি, সুর্বনা মজুমদার, সাবরিনা নিসা, নূরে আলম নয়ন, সাজ্জাদ সাজু, রাজিব সালেহীন, নিপু, মিরাজ, নজরুল ইসলাম, আনোয়ারুল আলম সজল, বেলাল আহমেদ মুরাদসহ আরও অনেকে।
বরাবরের মতো এবারের ‘ইত্যাদি’র শিল্প নির্দেশনা ও মঞ্চ পরিকল্পনায় ছিলেন নিয়মিত শিল্প নির্দেশক মুকিমুল আনোয়ার মুকিম। পরিচালকের সহকারী হিসেবে ছিলেন রানা সরকার ও মোহাম্মদ মামুন। অনুষ্ঠানটির রচনা, পরিচালনা ও উপস্থাপনায় হানিফ সংকেত। নির্মাণ করেছে ফাগুন অডিও ভিশন। এবারের পর্বের পৃষ্ঠপোষকতায় রয়েছে কেয়া কসমেটিকস লিমিটেড।
আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার রাত ৮টার বাংলা সংবাদের পর বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হবে জামালপুরে ধারণ করা ‘ইত্যাদি’র এই বিশেষ পর্ব।