একসময় যার কণ্ঠে ভেসে উঠত বাংলার মাটির গান, যার সুরে-সুরে মুগ্ধ হতো গ্রামবাংলার মানুষ, সেই লোকসংগীতের জীবন্ত কিংবদন্তি কাঙালিনী সুফিয়া আজ জীবনযুদ্ধের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। বয়সের ভার, শারীরিক অসুস্থতা আর চরম অর্থকষ্টে দিন কাটছে এই গুণী শিল্পীর।
সম্প্রতি বাথরুমে পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন কাঙালিনী সুফিয়া। দুর্ঘটনায় তার একটি হাত ভেঙে যায়। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে এখনো কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে পারেননি তিনি। ফলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ছাড়াই ভাঙা হাত নিয়ে শয্যাশায়ী অবস্থায় দিন পার করছেন দেশের লোকসংগীতের এই বরেণ্য শিল্পী।
বর্তমানে রাজবাড়ী সদর উপজেলার আলীপুর ইউনিয়নের কল্যাণপুরে সরকারিভাবে পাওয়া নিজ বাড়িতে বসবাস করছেন কাঙালিনী সুফিয়া। তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও চিকিৎসার ব্যয় বহন করার সামর্থ্য না থাকায় উদ্বেগে রয়েছেন পরিবারের সদস্য ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।
জানা গেছে, শিল্পীর মেয়ে পুষ্প কিছুদিনের জন্য কাজের প্রয়োজনে ঢাকায় ছিলেন। সেই সময় রাতে বাথরুমে যাওয়ার পথে পড়ে গিয়ে হাত ভেঙে যায় সুফিয়ার। অর্থাভাবে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে না পারায় প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় স্থানীয় এক কবিরাজের মাধ্যমে ভাঙা হাতে প্রাথমিকভাবে ‘জাব’ বেঁধে রাখা হয়েছে।
অসুস্থতার মধ্যেও কাঙালিনী সুফিয়ার কণ্ঠে ঝরে পড়ে অসহায়তার কথা। তিনি বলেন, টাকা না থাকায় ডাক্তার দেখাতে পারছি না। কবিরাজ দিয়েই চিকিৎসা চলছে। আগে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গেয়ে আয় করতাম। এখন বয়স আর অসুস্থতার কারণে সেটাও সম্ভব হয় না। আয়ের সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে। কোনোমতে দিন কাটছে। প্রতিবেশীরা খোঁজখবর নেয় বলেই বেঁচে আছি।
মেয়ে পুষ্প জানান, মায়ের দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত বাড়িতে ফিরে আসেন তিনি। অনেকের কাছে সহযোগিতা চাইলেও তেমন সাড়া মেলেনি। অর্থাভাবে এখনো ভালো কোনো চিকিৎসকের কাছে নেওয়া সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে আবার ৪ হাজার টাকার বিদ্যুৎ বিলও জমেছে। শেষ পর্যন্ত জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গেলে চিকিৎসা ও বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের জন্য ৭ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়। তবে এই অর্থ প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য বলে জানান তিনি।
পুষ্প বলেন, মা শুধু হাতের সমস্যাই নয়, হার্ট ও কিডনিসহ নানা জটিল রোগে ভুগছেন। যথাযথ চিকিৎসা করাতে পারলে হয়তো অনেকটাই সুস্থ রাখা যেত। এখন প্রতিবেশীদের সহায়তায় দুবেলা খাবার জোটে।
দীর্ঘ সংগীতজীবনে কাঙালিনী সুফিয়া লোকসংগীতকে পৌঁছে দিয়েছেন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও। তার কণ্ঠে গাওয়া অসংখ্য গান মানুষের হৃদয়ে আজও সমানভাবে বেঁচে আছে। অথচ সেই শিল্পীকেই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে চিকিৎসার অভাব আর অর্থসংকটের সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে।
সংস্কৃতিকর্মী, ভক্ত ও সচেতন নাগরিকদের অনেকেই মনে করছেন, দেশের লোকসংগীতকে সমৃদ্ধ করা এই শিল্পীর চিকিৎসা ও জীবনযাপনের দায়িত্ব নেওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সমাজের সামর্থ্যবান মানুষের। তাদের মতে, চিকিৎসার অভাবে এমন একজন কিংবদন্তি শিল্পীর কষ্ট পাওয়া শুধু ব্যক্তিগত নয়, এটি দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্যও অত্যন্ত বেদনাদায়ক একটি বিষয়।
বাংলার লোকগানের এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পী এখন সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান। তবে সেই প্রত্যাবর্তনের পথ কতটা সহজ হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও মানবিক সহযোগিতা পাওয়ার ওপর।