বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনের প্রখ্যাত অভিনেতা আমিরুল হক চৌধুরীকে দর্শক চেনেন অসাধারণ অভিনয়শৈলী ও স্মরণীয় সব চরিত্রের মাধ্যমে। তবে অনেকেই জানেন না, অভিনয়ে আসার আগে তিনি ছিলেন একজন সক্রিয় ছাত্রনেতা এবং রাজনীতির অঙ্গনেও তার উজ্জ্বল সম্ভাবনা ছিল।
পাবনার ঈশ্বরদীর ঐতিহ্যবাহী চৌধুরী পরিবারে জন্ম নেওয়া আমিরুল হক চৌধুরী ছাত্রজীবন থেকেই নেতৃত্বগুণের পরিচয় দেন। ঈশ্বরদী সরকারি কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্র সংসদের ভিপি (ভাইস প্রেসিডেন্ট) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে শহীদ ক্যাপ্টেন মুহাম্মদ মনসুর আলী তাকে আওয়ামী লীগের পাকশী শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মনোনীত করেন।
এরপর ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে পাবনা-ঈশ্বরদী আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য নৌকা প্রতীকও পেয়েছিলেন তিনি। সে সময় তার বয়স ছিল মাত্র ২৬ বছর। নির্বাচনে অংশ নিলে তৎকালীন পাকিস্তানের সর্বকনিষ্ঠ সংসদ সদস্য হওয়ার সম্ভাবনাও ছিল তার সামনে। কিন্তু রাজনীতির চেয়ে অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসাই শেষ পর্যন্ত তার জীবনের পথ নির্ধারণ করে দেয়।
শিক্ষাজীবনেও ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। ১৯৬২ সালে ঈশ্বরদী স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন সম্পন্ন করেন। এরপর ১৯৬৪ সালে আইএ এবং ১৯৬৬ সালে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ থেকে। ১৯৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর (এমএ) ডিগ্রি লাভ করেন।
অভিনয়ের প্রতি তার আগ্রহের শুরু শৈশবেই। স্কাউটিং করতে গিয়ে রাজশাহীর পাহাড়পুরে এক শিক্ষক তাকে একজন অসুস্থ মানুষকে সাহায্য করার দৃশ্য অভিনয় করতে বলেছিলেন। সেই ছোট্ট অভিনয়ই যেন তার শিল্পীজীবনের প্রথম পদক্ষেপ। পরবর্তীতে পাকশীর মঞ্চে নিয়মিত নাট্যচর্চার মধ্য দিয়ে তিনি অভিনয়জগতে নিজের অবস্থান তৈরি করেন।
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে অসংখ্য নাটকে অভিনয় করলেও ‘হাড়কিপটে’ নাটকের চরিত্রটি তাকে এনে দেয় ব্যাপক জনপ্রিয়তা। এই নাটকের মাধ্যমে তিনি পৌঁছে যান দেশের ঘরে ঘরে এবং হয়ে ওঠেন দর্শকের প্রিয় মুখ।
স্বাধীনতার পর সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে এলেও সংস্কৃতিচর্চা থেকে কখনো দূরে যাননি আমিরুল হক চৌধুরী। নাট্যাঙ্গনের উন্নয়ন ও শিল্পচর্চায় তিনি আজীবন অবদান রেখে চলেছেন। ছাত্রনেতা থেকে সফল অভিনেতা হয়ে ওঠার তার এই যাত্রা নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।