ফলে ঢালিউডে এখন নতুন এক সংকট তৈরি হয়েছে। সিনেমা আছে, দর্শক আছে, কিন্তু পর্যাপ্ত হল নেই।
একসময় দেশের আনাচে-কানাচে ছিল অসংখ্য সিনেমা হল। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে দেশে প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা ছিল প্রায় দেড় হাজার। এরপর ধীরে ধীরে সেই সংখ্যা কমতে থাকে। দর্শক কমেছে, অনেক হল লোকসানে পড়েছে, পুরোনো অবকাঠামো আধুনিক করা হয়নি। একপর্যায়ে বহু হল মালিক সিনেমা ব্যবসা গুটিয়ে জায়গাটি অন্য কাজে ব্যবহার করাকে বেশি লাভজনক মনে করেছেন। কোথাও হল ভেঙে তৈরি হয়েছে মার্কেট, কোথাও বহুতল ভবন কিংবা অন্য বাণিজ্যিক স্থাপনা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সচল প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা কয়েক ডজনের ঘরে নেমে আসার তথ্যও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
হল বন্ধ হওয়ার পেছনে অবশ্য শুধু ব্যবসায়িক লোকসানই দায়ী নয়। একটা সময় দেশের চলচ্চিত্রে অশ্লীলতা, কাটপিস ও নিম্নমানের সিনেমার বিস্তার নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ ও দুই হাজারের শুরুর দিকে এসব সিনেমার কারণে পারিবারিক দর্শকের একটি বড় অংশ হলবিমুখ হয়ে পড়েন। সিনেমা হল নিয়ে তৈরি হয় নেতিবাচক ধারণা। ফলে যে হলগুলো একসময় পরিবার নিয়ে দর্শকে ভরা থাকত, সেগুলোর অনেকগুলোই ধীরে ধীরে দর্শক হারাতে শুরু করে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় পাইরেসি ও বিনোদনের নতুন মাধ্যমের বিস্তার। টেলিভিশন, স্যাটেলাইট চ্যানেল, ভিসিডি-ডিভিডির পর ইউটিউব এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্ম দর্শকের হাতে এনে দেয় অসংখ্য বিকল্প। ঘরে বসেই বিনোদনের সুযোগ বাড়তে থাকায় সিনেমা হলে যাওয়ার অভ্যাসও কমতে থাকে।
তবে সময়ের সঙ্গে চলচ্চিত্রও বদলেছে। নতুন প্রজন্মের নির্মাতা, নতুন গল্প এবং মানসম্মত সিনেমার কারণে দর্শকের মধ্যে আবারও বড় পর্দায় দেশীয় সিনেমা দেখার আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রদর্শন ব্যবস্থাতেও এসেছে নতুন সংযোজন, সিনেপ্লেক্স।
পুরোনো সিনেমা হলের তুলনায় আধুনিক সিনেপ্লেক্স দর্শককে দিয়েছে ভিন্ন অভিজ্ঞতা। উন্নত শব্দ ও ছবি, আরামদায়ক আসন, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং পরিবার নিয়ে সিনেমা দেখার সুযোগ শহুরে দর্শকের কাছে নতুন করে হলমুখী হওয়ার কারণ তৈরি করেছে। রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে সিনেপ্লেক্স সংস্কৃতি জনপ্রিয়ও হয়েছে।
কিন্তু এখানেও সংকট পুরোপুরি কাটেনি। কারণ আধুনিক সিনেপ্লেক্সের বড় অংশ এখনও রাজধানী ও কয়েকটি বড় শহরকেন্দ্রিক। দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বিপুলসংখ্যক দর্শকের কাছে সেই সুবিধা এখনও পৌঁছায়নি। ফলে একদিকে শহরে সিনেপ্লেক্স বাড়ছে, অন্যদিকে দেশের অনেক এলাকায় পুরোনো হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
অর্থাৎ, পুরোনো হল হারিয়ে যাচ্ছে, নতুন সিনেপ্লেক্স তৈরি হচ্ছে, কিন্তু দেশের সব দর্শকের কাছে বড় পর্দার সিনেমা পৌঁছানোর সুযোগ বাড়ছে না।
এই সংকট সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে বড় বাজেটের সিনেমা মুক্তির সময়। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ বাড়ছে। তারকা শিল্পী, উন্নত প্রযুক্তি, বড় সেট, অ্যাকশন ও প্রচারণায় প্রযোজকেরা কোটি কোটি টাকা খরচ করছেন। ‘বরবাদ’, ‘রাক্ষস’-এর মতো বড় পরিসরের সিনেমা নিয়েও দর্শকের আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
কিন্তু সিনেমা মুক্তির সময় আবার সামনে আসে পুরোনো প্রশ্ন, সিনেমাটি চলবে কোথায়?
বিশেষ করে ঈদ কিংবা বড় উৎসবে একাধিক সিনেমা মুক্তি পেলে সীমিত সংখ্যক প্রেক্ষাগৃহ ভাগ করে নিতে হয়। কোনো সিনেমার দর্শক আগ্রহ থাকলেও পর্যাপ্ত শো না পাওয়ার ঝুঁকি থাকে। আবার কোনো ছবি ভালো চললেও বাড়তি শো দেওয়ার মতো হল পাওয়া যায় না। এতে দর্শক যেমন কাঙ্ক্ষিত সময়ে টিকিট পান না, তেমনি প্রযোজকের বিনিয়োগও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
তাই হল সংকট এখন শুধু প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা কমে যাওয়ার সমস্যা নয়। এটি সরাসরি চলচ্চিত্রের ব্যবসা ও ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত।
প্রয়োজন পুরোনো হলগুলোকে আধুনিক করে ফিরিয়ে আনা। যেসব এলাকায় হল বন্ধ হয়ে গেছে, সেখানে নতুন প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ করা। পাশাপাশি সিনেপ্লেক্স ও মাল্টিপ্লেক্স সংস্কৃতিকে ঢাকার বাইরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও ছড়িয়ে দেওয়া। কারণ শুধু রাজধানীর দর্শককে কেন্দ্র করে একটি চলচ্চিত্র শিল্প দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হতে পারে না।
একসময় অশ্লীলতা ও নিম্নমানের সিনেমার কারণে যে দর্শক হলবিমুখ হয়েছিল, এখন মানসম্মত সিনেমার মাধ্যমে সেই দর্শককে আবার ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। দর্শক এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। তারা ভালো গল্প, অভিনয়, নির্মাণ ও প্রযুক্তির মান চান। সেই চাহিদা পূরণ করতে পারলে হলমুখী দর্শক আরও বাড়তে পারে।
কিন্তু দর্শক ফিরলেও তাদের বসার জায়গা যদি না থাকে, তাহলে সেই প্রত্যাবর্তন কতটা কাজে আসবে?
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র এখন একদিকে নতুন সম্ভাবনার সময় পার করছে, অন্যদিকে প্রদর্শন ব্যবস্থার পুরোনো সংকটও বয়ে বেড়াচ্ছে। সিনেমা নির্মাণে বিনিয়োগ বাড়ছে, নতুন সিনেমা নিয়ে দর্শকের আগ্রহ বাড়ছে, সিনেপ্লেক্সও তৈরি হচ্ছে। তবু দেশের বড় একটি অংশের দর্শকের জন্য বড় পর্দা এখনও সহজলভ্য নয়।
চলচ্চিত্র শুধু ক্যামেরা, শিল্পী আর গল্পের বিষয় নয়। একটি সিনেমার পূর্ণতা আসে তখনই, যখন সেটি দর্শকের কাছে পৌঁছায়।
ঢালিউডে এখন তাই প্রশ্ন শুধু কত সিনেমা তৈরি হচ্ছে তা নয়। বড় প্রশ্ন হলো, সেই সিনেমাগুলো দেখার মতো পর্যাপ্ত ও মানসম্মত হল আমরা তৈরি করতে পারছি কি না।