বলিউডের কিংবদন্তি অভিনেত্রী শর্মিলা ঠাকুর সাধারণত ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে খুব একটা মুখ খোলেন না। তবে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে প্রয়াত স্বামী, ভারতের সাবেক ক্রিকেট অধিনায়ক মনসুর আলী খান পতৌদিকে নিয়ে বেশ কিছু অজানা স্মৃতি ভাগ করে নিয়েছেন। সেখানে উঠে এসেছে তাঁদের প্রেম, বিয়ে, সামাজিক বাধা এবং দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনের নানা অপ্রকাশিত অধ্যায়।
শর্মিলা জানান, বিয়ের আগেই তিনি ও পতৌদি একসঙ্গে বসবাস শুরু করেছিলেন। সে সময় এটিই তাঁদের কাছে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ও সুবিধাজনক সিদ্ধান্ত ছিল। হাস্যরসের সঙ্গেই তিনি স্বীকার করেন, তখন সংসার সামলানোর কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না তাঁর। ফলে গৃহস্থালির অনেক কাজই ঠিকমতো হতো না এবং অনেক সময় প্রয়োজনীয় কাজের জন্য পতৌদিকে বাইরে যেতে হতো। পরে ধীরে ধীরে তিনি সংসারের দায়িত্ব নিতে শিখে যান।
১৯৬৮ সালে ভিন্ন ধর্মে তাঁদের বিয়ে তৎকালীন সমাজে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। শর্মিলার ভাষ্য, তিনি ও পতৌদি নিজেদের পেশাগত কাজে ব্যস্ত থাকলেও দুই পরিবারকে নানা ধরনের চাপের মুখে পড়তে হয়েছিল। সংবাদমাধ্যমেও তাঁদের সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা নেতিবাচক মন্তব্য প্রকাশিত হয়েছিল।
শুধু সমালোচনাই নয়, তাঁদের বিয়েকে ঘিরে প্রাণনাশের হুমকিও এসেছিল। শর্মিলা জানান, তাঁর বাবা-মায়ের কাছে টেলিগ্রামের মাধ্যমে হত্যার হুমকি পাঠানো হয়েছিল। নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রথমে ফোর্ট উইলিয়ামে বিয়ের আয়োজনের পরিকল্পনা থাকলেও শেষ মুহূর্তে স্থান পরিবর্তন করে এক রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়।
তিনি আরও জানান, নির্মাতা যশ চোপড়াও রাজপরিবারে বিয়ে করার বিষয়ে তাঁকে সতর্ক করেছিলেন। তবে শর্মিলা সেটিকে কোনো নেতিবাচক মন্তব্য হিসেবে নয়, বরং একজন শুভাকাঙ্ক্ষীর আন্তরিক পরামর্শ হিসেবেই গ্রহণ করেছিলেন।
দাম্পত্য জীবনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শর্মিলা বলেন, ধৈর্য, সংযম এবং মানুষকে সম্মান করার শিক্ষা তিনি পতৌদির কাছ থেকেই পেয়েছেন। তাঁর স্বামী কখনো রাগের বশে অপমানজনক কথা বলতেন না। বরং আচরণের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিতেন কীভাবে একটি সম্পর্ককে সম্মান ও ভালোবাসা দিয়ে টিকিয়ে রাখতে হয়।
পতৌদির একটি উপদেশ আজও তাঁর মনে গেঁথে আছে। তিনি বলতেন, ‘রাগের মাথায় এমন কোনো কথা বলা উচিত নয়, যা পরে আর ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। কারণ, কথার আঘাত অনেক সময় দীর্ঘস্থায়ী হয়ে থাকে।’
একটি মজার ঘটনাও শোনান শর্মিলা। একবার ক্রিকেট নিয়ে ভুল মন্তব্য করায় পতৌদি টেবিলের নিচে পা দিয়ে ইশারা করে তাঁকে থামিয়ে দেন। পরে হাসতে হাসতেই বলেন, ক্রিকেট নিয়ে কথা না বলাই ভালো।
শর্মিলা আরও জানান, তিনি বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেত্রী হলেও পতৌদি খুব একটা তাঁর সিনেমা দেখতেন না। বরং অন্য অভিনেত্রীদের অভিনীত চলচ্চিত্র দেখতেই বেশি আগ্রহী ছিলেন। বিষয়টি প্রথমদিকে কিছুটা খারাপ লাগলেও পরে তিনি সেটিকে স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিয়েছিলেন।
২০১১ সালে মনসুর আলী খান পতৌদির মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁদের ৪৩ বছরের দাম্পত্য জীবন ছিল ভারতীয় চলচ্চিত্র ও ক্রিকেট অঙ্গনের অন্যতম আলোচিত সম্পর্ক। নানা বিতর্ক, সামাজিক বিরোধিতা ও হুমকির মুখেও তাঁদের সংসার টিকে ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা ও ভালোবাসার দৃঢ় ভিত্তির ওপর।