
টলিপাড়ায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। জনপ্রিয় অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় আর নেই। শুটিং করতে গিয়ে পানিতে ডুবে তার মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। মাত্র ৪৩ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন এই অভিনেতা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবর, রোববার তালসারি সমুদ্রসৈকতে ‘ভোলে বাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের শুটিং চলছিল। শুটিংয়ের একপর্যায়ে পানিতে নামেন রাহুল। পরে হঠাৎ তিনি তলিয়ে গেলে সহকর্মী ও ইউনিটের টেকনিশিয়ানরা দ্রুত তাকে উদ্ধার করেন।
এরপর তাকে দ্রুত দিঘা হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পানিতে ডুবে তার মৃত্যু হয়েছে।
পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পুলিশও মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অতীশ বিশ্বাস জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে ডুবে যাওয়ার কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে পুরো ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
ধারাবাহিকটির সহ-অভিনেতা ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, শুটিং শেষে সবাই যখন মধ্যাহ্নভোজে যান, তখন রাহুল আরও কয়েকটি দৃশ্য ধারণ করবেন বলে সেখানেই থেকে যান। পরে দীর্ঘ সময় তাকে দেখা না গেলে খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। একপর্যায়ে পানির নিচে তাকে পাওয়া যায়।
ঘটনার সঠিক কারণ এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে তার এমন আকস্মিক মৃত্যুতে টলিপাড়াজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। সহকর্মীদের ভাষায়, একজন সুস্থ-সবল মানুষ এভাবে হঠাৎ চলে যাওয়ায় তারা গভীরভাবে মর্মাহত।
নাট্যমঞ্চ থেকেই অভিনয়ের শুরু
১৯৮৩ সালের ১৬ অক্টোবর এক নাট্য পরিবারে জন্ম রাহুলের। ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি ছিল গভীর টান। বাবা বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর থিয়েটার দল ‘বিজয়গড় আত্মপ্রকাশ’-এর হাত ধরে মাত্র তিন বছর বয়সেই মঞ্চে পা রাখেন তিনি। প্রথম অভিনয় ছিল ‘রাজদর্শন’ নাটকে।
এরপর ধীরে ধীরে মঞ্চ, টেলিভিশন ও সিনেমা মিলিয়ে গড়ে ওঠে তার দীর্ঘ অভিনয়জীবন। ক্যারিয়ারে প্রায় ৪৫০টিরও বেশি স্টেজ শো করেছেন রাহুল। থিয়েটারের প্রতি তার ভালোবাসা শেষদিন পর্যন্ত অটুট ছিল।
ছোট পর্দা থেকে বড় পর্দায় উত্থান
সিনেমায় আসার আগে ছোট পর্দাতেই নিজের অভিনয়ের ভিত শক্ত করেছিলেন রাহুল। জি বাংলার জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘খেলা’-তে আদিত্য চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দর্শকদের নজর কাড়েন।
তবে তার জীবনের মোড় ঘুরে যায় ২০০৮ সালে। রাজ চক্রবর্তী পরিচালিত ‘চিরদিনি তুমি যে আমার’ ছবিতে প্রিয়াঙ্কা সরকার-এর বিপরীতে অভিনয় করে রাতারাতি জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে আসেন তিনি। ছবিটি বক্স অফিসে দারুণ সাফল্য পায় এবং রাহুলকে এনে দেয় ব্যাপক পরিচিতি ও তারকাখ্যাতি।
এই ছবির গান, গল্প আর রাহুলের অনবদ্য উপস্থিতি আজও দুই বাংলার দর্শকের কাছে নস্টালজিয়ার অংশ হয়ে আছে। ছবিটির জন্য তিনি বেশ কয়েকটি পুরস্কারও অর্জন করেন।
একের পর এক জনপ্রিয় কাজ
‘চিরদিনি তুমি যে আমার’-এর সাফল্যের পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি রাহুলকে। তিনি অভিনয় করেছেন ‘জ্যাকপট’, ‘লাভ সার্কাস’, ‘শোনো মন বলি তোমায়’, ‘পতি পরমেশ্বর’, ‘কাগজের বউ’, ‘আকাশ অংশত মেঘলা’-সহ একাধিক চলচ্চিত্রে।
শুধু সিনেমা নয়, টেলিভিশনের পর্দাতেও তিনি ছিলেন সমান উজ্জ্বল। ‘দেশের মাটি’ ধারাবাহিকের রাজা চরিত্রে তার অভিনয় দর্শকের মনে আলাদা জায়গা করে নেয়। পাশাপাশি একাধিক ওয়েব সিরিজ, নাটক ও মঞ্চনাটকেও নিয়মিত কাজ করেছেন তিনি।
তার অভিনীত সাম্প্রতিক কাজগুলোর মধ্যেও ছিল সিনেমা, সিরিজ ও মঞ্চনাটক। অভিনয়ের প্রতি তার নিষ্ঠা ও শ্রম সবসময়ই সহকর্মীদের কাছে প্রশংসিত ছিল।
ব্যক্তিজীবনেও ছিলেন আলোচনায়
অভিনয়জীবনের মতো ব্যক্তিজীবনেও রাহুল ছিলেন আলোচিত। সহ-অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকার-এর সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্কের পর ২০১০ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। তাদের সংসারে আসে একমাত্র সন্তান সহজ বন্দ্যোপাধ্যায়।
পরে ২০১৭ সালে তাদের বিচ্ছেদের খবর অনুরাগীদের মন খারাপ করলেও, সময়ের ব্যবধানে তারা আবার কাছাকাছি আসেন। ব্যক্তিজীবনের নানা উত্থান-পতনের মধ্যেও ছেলে সহজকে ঘিরে তাদের সম্পর্ক ছিল সবসময়ই আলোচনায়।
সম্প্রতি রাহুল ‘সহজকথা’ নামে একটি পডকাস্ট শুরু করেছিলেন, যা বেশ সাড়া ফেলেছিল।
স্মৃতিতে বেঁচে থাকবেন রাহুল
রাহুল অরুণোদয়ের চলে যাওয়া মানে শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেতার বিদায় নয়, বরং একজন নিবেদিতপ্রাণ মঞ্চকর্মী, প্রতিভাবান শিল্পী এবং দর্শকপ্রিয় মুখের প্রস্থান।
তিনি হয়তো আজ আর নেই, কিন্তু তার অভিনীত চরিত্র, সংলাপ, অভিব্যক্তি এবং অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত বাঙালির হৃদয়ে অনেকদিন বেঁচে থাকবে।
‘চিরদিনি’ সত্যিই অম্লান হয়ে থাকবেন রাহুল অরুণোদয়।
Leave a Reply