কানিজ ফাতেমা সূচীকে দর্শক দীর্ঘদিন ধরেই একজন সংগীতশিল্পী হিসেবে চেনেন। তবে গানেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি তিনি। অভিনয়, আবৃত্তি, উপস্থাপনা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থেকে ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছেন বহুমাত্রিক এক শিল্পীসত্তা। বর্তমানে অভিনয়েও নিজের অবস্থান শক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে চলেছেন এই শিল্পী।
সূচীর ভাষ্য, ছোটবেলা থেকেই তিনি নিজেকে একজন শিল্পী হিসেবে কল্পনা করতেন। সাংস্কৃতিক সংগঠন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে কবিতা আবৃত্তি, গান, মঞ্চনাটক ও পথনাটকে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। সেখান থেকেই অভিনয়ের প্রতি তার আগ্রহ আরও গভীর হয়।
তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই মনে হতো আমি অভিনেত্রী হব। অনেকেই বলতেন আমার চেহারা ও আচরণ নায়িকাদের মতো। সেই স্বপ্ন নিয়েই বড় হয়েছি।
অভিনয়ের যাত্রায় তার প্রথম বড় সুযোগ আসে নির্মাতা তৌকীর আহমেদের ‘ফাগুন হাওয়ায়’ চলচ্চিত্রে। এরপর একে একে ‘সংসার আমার ভাল্লাগেনা’, ‘ভাবির সংসার’, ‘বেইমান বৌয়ের শেষ পরিণতি’, ‘ভাইয়ের শত্রু ভাই’সহ অর্ধশতাধিক নাটকে অভিনয় করেন। গত এক বছরে নয়টি সিনেমায় কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। সামনে মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে ‘সোলজার’, ‘ইব্রাহিম’, ‘দ্য লাস্ট নাইট কনফেশন’, ‘সোনালী সৈকতে’, ‘সঙ্গী’ ও ‘সাঁওতাল’সহ বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র।

গান ও অভিনয়ের মধ্যে কোনটিকে বেশি ভালোবাসেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে সূচী বলেন, গান আমার আবেগ থেকে আসে, আর অভিনয় আমার জীবনগাথা। দুটোই ভালো লাগে, তবে অভিনয়ে আমি বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।
সংগীতশিল্পী থেকে অভিনেত্রী হয়ে ওঠার পথটাও সহজ ছিল না। নানা সময় তাকে শুনতে হয়েছে, একটি মানুষ একসঙ্গে এতগুলো পরিচয় নিয়ে এগোতে পারে না। তবে সমালোচনাকে কখনো গুরুত্ব দেননি তিনি।
তার ভাষায়, মানুষ বলত গান করো, আবার উপস্থাপনা করো, অভিনয়ও করো। একটা কাজ বেছে নিতে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, যার মধ্যে যে প্রতিভা আছে, তাকে সেটাই অনুসরণ করা উচিত। তাই কোনো কিছুই ছাড়িনি।
সম্প্রতি আলোচিত চলচ্চিত্র ‘মালিক’-এ অভিনয় করে নতুনভাবে আলোচনায় এসেছেন কানিজ ফাতেমা সূচী। তিনি জানান, ছবিটিতে অভিনয়ের জন্য প্রথমে অডিশন দেন। পরে কাস্টিং টিম থেকে যোগাযোগ করা হলে কাজটি করার সুযোগ পান।
সূচী বলেন, অডিশনের পরই বুঝতে পেরেছিলাম এটি বড় পরিসরের একটি গল্প। পরিচালক সাইফ চন্দনের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। পুরো টিম ছিল অত্যন্ত পরিশ্রমী।
শুটিংয়ের একটি অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে তিনি জানান, সাঁতার না জানলেও একটি দৃশ্যের প্রয়োজনে নদীতে নেমে শুটিং করতে হয়েছিল তাকে। সেই অভিজ্ঞতা ছিল তার অভিনয়জীবনের অন্যতম চ্যালেঞ্জিং মুহূর্ত।
‘মালিক’ সিনেমায় আরেফিন শুভর মায়ের চরিত্রে অভিনয় করা প্রসঙ্গে সূচী বলেন, এই বয়সে এমন একটি চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পাওয়া আমার জন্য আশীর্বাদ। পরিচালক হয়তো মনে করেছেন আমি চরিত্রটির জন্য উপযুক্ত। শুভ ভাইয়ের মা হওয়ার চেয়ে বড় কথা হলো, পুরো গল্পের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশের দায়িত্ব আমার ওপর ছিল। দর্শক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পেয়েছি, এটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া।
অভিনয়ের পাশাপাশি সংগীত নিয়েও ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি। বর্তমানে ২৫টির বেশি নতুন গান প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে। এর মধ্যে রয়েছে একাধিক একক ও দ্বৈত গান। গীতিকার কাব্যিক পলাশের সঙ্গে পাঁচটি ডুয়েট ও পাঁচটি একক গান, কবি আবদুর রহিমের লেখা ১০টি একক গান এবং শরিফুল ইসলাম শামীমের লেখা পাঁচটি একক গান প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। পাশাপাশি কয়েকটি চলচ্চিত্রের গানও শিগগিরই প্রকাশ পাবে বলে জানান তিনি।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে সূচী বলেন, অভিনয়ে আমি আমার সেরাটা দিতে চাই। একজন ভালো অভিনেত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই এবং বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে ধারণ করে কাজ করে যেতে চাই।
শিল্পী পরিচয়ের বাইরে নিজেকে একজন মানবিক মানুষ হিসেবেই দেখতে চান কানিজ ফাতেমা সূচী। তিনি বিশ্বাস করেন মূল্যবোধ, মানবিকতা এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য নিহিত।
সাংস্কৃতিক চর্চার অনুপ্রেরণা পরিবার থেকেই পেয়েছেন বলে জানান এই শিল্পী। তার বাবা সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই পরিবারে সংস্কৃতিচর্চার পরিবেশ দেখেছেন তিনি। সেই পরিবেশই আজকের কানিজ ফাতেমা সূচীকে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।