
ডেস্ক নিউজ: গানের আসর তখন জমে উঠেছে পুরোদমে। দর্শকে ঠাসা ভেন্যু, মঞ্চে দাঁড়িয়ে একের পর এক জনপ্রিয় গান গেয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ করছেন ভারতের খ্যাতিমান গায়ক সনু নিগম। করাচির সেই রাত যেন শুধুই সুর, উচ্ছ্বাস আর তারকামুগ্ধতায় ভরা ছিল। কিন্তু হঠাৎই সবকিছু বদলে যায় এক বিকট বিস্ফোরণের শব্দে।
মুহূর্তের মধ্যে আনন্দমুখর পরিবেশ ঢেকে যায় আতঙ্কে। সুরের মূর্ছনার জায়গা নেয় মৃত্যুভয়। দুই দশক আগে পাকিস্তানের করাচিতে ঘটে যাওয়া সেই ভয়াবহ ঘটনার স্মৃতি সম্প্রতি আবারও সামনে এনেছেন সোনু নিগম নিজেই।
ভারতীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটে ২০০৪ সালের ১০ মার্চ। সে সময় ভারত-পাকিস্তানের রাজনৈতিক সম্পর্ক খুব মসৃণ না হলেও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে দুই দেশের শিল্পীদের যাতায়াত ছিল তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক। সেই ধারাবাহিকতায় করাচির একটি কনসার্টে অংশ নিতে গিয়েছিলেন সোনু নিগম। প্রিয় শিল্পীকে কাছ থেকে দেখতে সেদিন ভেন্যুতে ভিড় করেছিলেন হাজারো পাকিস্তানি ভক্ত।
কিন্তু অনুষ্ঠান শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই কনসার্টস্থলের বাইরে ঘটে ভয়াবহ বোমা বিস্ফোরণ। এতে কয়েকজন নিহত হন, আহত হন আরও অনেকে। বিস্ফোরণের শব্দে মঞ্চ ও দর্শকসারি জুড়ে নেমে আসে চরম আতঙ্ক।
স্বাভাবিকভাবেই সোনু নিগম এবং উপস্থিত সবাই ভীষণভাবে বিচলিত হয়ে পড়েন। তবে সেই দুঃসহ মুহূর্তেও দর্শকদের অবিচল উপস্থিতি ও সাহস তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি পুরনো ভিডিও শেয়ার করে তিনি সেই রাতের রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার কথা আবারও স্মরণ করেন। সোনুর ভাষ্য, সেদিন তিনি যেন মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে এসেছিলেন।
ভিডিওতে দেখা যায়, বিস্ফোরণের পর উদ্বিগ্ন কণ্ঠে তিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে দর্শকদের উদ্দেশে বলেন,এই সন্ধ্যায় আমি আপনাদের মনোরঞ্জন করার চেষ্টা করব। আপনাদের তাড়া নেই তো?
প্রিয় শিল্পীর এমন সাহসী উচ্চারণে দর্শকরাও চিৎকার করে সাড়া দেন। ভয় আর বিশৃঙ্খলার মাঝেও যেন তৈরি হয় এক অন্যরকম মানবিক বন্ধন।
এরপর আতঙ্ককে পেছনে ফেলে সোনু নিগম গেয়ে শোনান তার একের পর এক জনপ্রিয় গান। ‘কাভি খুশি কাভি গাম’, ‘ম্যায় হুঁ না’, ‘কাল হো না হো’ এবং ‘ভির জারা’-র মতো কালজয়ী গানে আবারও প্রাণ ফিরে পায় আসর। বিশেষ করে ‘সুরজ হুয়া মাধ্যম’ পরিবেশনের সময় দর্শকদের আবেগ ছিল স্পষ্ট ও তীব্র।
পরে সোনু নিগম আবেগঘন কণ্ঠে জানান, সেই রাতে তাকে এবং তার দলকে নিরাপদ রাখতে বুক দিয়ে আগলে রেখেছিলেন সাধারণ পাকিস্তানিরাই। তাদের আন্তরিকতা, ভালোবাসা ও সহযোগিতার কারণেই তিনি প্রাণে বেঁচে ফিরতে পেরেছিলেন।
অনুষ্ঠানটির আয়োজক ফারকান সিদ্দীকী-ও জানিয়েছেন, সেই ঘটনার পর থেকে প্রতি বছর ১০ এপ্রিল সোনু নিগম তাকে একটি বার্তা পাঠান। সেখানে তিনি ফিরে দেখেন সেই জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ, সেই ভয়াবহ অথচ মানবিক এক রাতকে।
সোনুর কথায়, সেদিন হামলা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু আমাকে বাঁচিয়েছিলেন পাকিস্তানিরাই।
দীর্ঘ ২০ বছর পর তার এই স্মৃতিচারণ যেন আবারও মনে করিয়ে দিল, রাজনীতি, সীমান্ত বা রাষ্ট্রীয় টানাপোড়েনের বাইরেও মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, শিল্পের প্রতি টান এবং মানবিকতা অনেক বড় সত্য।
উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক যতই উত্তপ্ত থাকুক না কেন, সেই সফরে সোনু নিগমের গাওয়া গানগুলো আজও দুই দেশের মানুষের কাছেই সমানভাবে প্রিয় ও স্মরণীয়।
Leave a Reply